ইসলাম একটি ঐক্যবদ্ধ উম্মাহর শিক্ষা দেয়। কিন্তু ইতিহাস ও বাস্তবতা বলছে, উম্মাহ বারবার ভেঙে পড়েছে, মতবাদ, দল, বর্ণ, ভাষা এমনকি ক্ষুদ্রস্বার্থকে কেন্দ্র করে। কুরআন হাদীসে ঐক্যবদ্ধ থাকার ব্যাপারে বেশ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। রয়েছে অনৈক্য আর গোড়ামীর ভয়ঙ্কর পরিণাম।
উম্মাহর ঐক্য ব্যাপারে অসংখ্য আয়াতের মাঝে
إِنَّ هَـٰذِهِۦٓ أُمَّتُكُمْ أُمَّةًۭ وَٰحِدَةًۭ وَأَنَا۠ رَبُّكُمْ فَٱعْبُدُونِ
“নিশ্চয়ই এই তোমাদের উম্মাহ একটিমাত্র উম্মাহ, আর আমিই তোমাদের পালনকর্তা। অতএব, তোমরা আমারই ‘ইবাদত করো।”
[সূরা আল-আম্বিয়া,৯২]
এই আয়াতটি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়, মুসলিম উম্মাহ মূলত একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি — জাতি, ভাষা, অঞ্চল, বর্ণ বা দল এর ভিত্তিতে নয়; বরং ঈমান ও তাওহীদ-এর ভিত্তিতে।
‘উম্মাহ’ শব্দের অর্থ, এক দল মানুষ যারা একই আদর্শ, বিশ্বাস ও পথে চলে। আল্লাহ তাআলা এখানে আমাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন:
“তোমরা এক উম্মাহ, একক জাতি — কারণ তোমাদের প্রভু একজন, এবং তোমাদের ‘ইবাদত’ ও পথচলা কেবল তাঁরই উদ্দেশ্যে হওয়া উচিত।”
আজ যখন উম্মাহ নানা মত-পথে বিভক্ত, এই আয়াত আমাদের আহ্বান করে মূল পরিচয়ে ফিরে যেতে — তাওহীদের ভিত্তিতে ঐক্য পারস্পরিক সহযোগিতা দল-মতের ঊর্ধ্বে উঠে এক আল্লাহর গোলামীতে।
কিন্তু উম্মাহ এবং তার রাহবাররা বিপরীতে বিভক্তি ও পারস্পরিক কাদা ছুড়াছুড়িতে আরো দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
এ ব্যাপারে কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত ও কিছু কথা:
فَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُم بَيْنَهُمْ زُبُرًا ۖ كُلُّ حِزْبٍۢ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
অর্থ: “তারা নিজেদের দ্বীনকে বিভিন্ন খণ্ডে বিভক্ত করেছে, প্রত্যেক দল তাদের নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে গর্বিত ও আনন্দিত।”
[সূরা আল মুমিনুন,৫৩]
- দলাদলি ও বিভক্তির মূল কারণ:
আত্মকেন্দ্রিকতা ও দলীয় স্বার্থ বড় হয়ে ওঠে ইসলামের মূলনীতির চেয়ে।
মতানৈক্যকে শত্রুতা ও বিদ্বেষে রূপান্তর করা হয়।
ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, দলীয় গোঁড়ামি এবং দলনির্ভর সত্য-মিথ্যার মানদণ্ড তৈরি হয়।
রাসূল ﷺ বলেছেন: “যে ব্যক্তি দলবাজির জন্য আহ্বান করে, তার জন্য জাহান্নাম।”
[আবু দাউদ, হাদীস: ৫১২১] - গোঁড়ামি:
নিজের দল, মত, মাজহাব বা পীর-মুরশিদকে ভুল হোক বা ঠিক, অন্ধভাবে সমর্থন করা।
অন্যের মত বা দলকে কটাক্ষ করা, তাদেরকে ‘বাতিল’ সাব্যস্ত করা। নিজের দল ও ব্যক্তিকে উপরে তুলতে প্রয়োজনে ডাহা মিথ্যা বলতেও যবান কাপেনা।
কুরআনে গোঁড়ামির প্রতি কঠোর নিন্দা এসেছে।
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ ٱتَّبِعُوا۟ مَآ أَنزَلَ ٱللَّهُ قَالُوا۟ بَلْ نَتَّبِعُ مَآ أَلْفَيْنَا عَلَيْهِ ءَابَآءَنَا
অর্থ: “যখন তাদের বলা হয়: ‘আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন, তার অনুসরণ করো’, তখন তারা বলে: ‘না, আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদের পথ অনুসরণ করবো।’” [সূরা আল-বাকারা: ১৭০] - অহংকার ও নিজেদের দল নিয়ে মত্ততা:
সত্য সামনে এলেও শুধু দল বা গোষ্ঠীর অহংকারে তা অস্বীকার করা হয়।
মনে করা হয়, “আমরাই আনাল হক, বাকিরা ভুল।”
ইবলিসের পতনের প্রধান কারণ ছিল অহংকার।
أَبَىٰ وَٱسْتَكْبَرَ وَكَانَ مِنَ ٱلْكَٰفِرِينَ
অর্থ: “সে অহংকার করলো এবং কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।”
[সূরা আল-বাকারা: ৩৪] - উপহাস ও ব্যঙ্গ – বিভক্তির ইন্ধন:
দল বা মতের পার্থক্যকে কেন্দ্র করে একে অন্যকে উপহাস ও বিদ্রুপ করা।
কুরআন এই বিষয়ে কঠোরভাবে নিষেধ করেছে। কিন্তু এসব নিষেধের বাণী জানা বুঝা সত্বেও যখন তাদের থেকে এসব নোংরামি কথা বা লিখা দেখা যায়,তখন ফিতনার দ্বার আরো প্রশস্ত হয়।
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوا۟ لَا يَسْخَرْ قَوْمٌۭ مِّن قَوْمٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُونُوا۟ خَيْرًۭا مِّنْهُمْ ۖ وَلَا نِسَآءٌۭ مِّن نِّسَآءٍ عَسَىٰٓ أَن يَكُنَّ خَيْرًۭا مِّنْهُنَّ ۖ وَلَا تَلْمِزُوٓا۟ أَنفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا۟ بِٱلْأَلْقَـٰبِ ۖ بِئْسَ ٱلِٱسْمُ ٱلْفُسُوقُ بَعْدَ ٱلْإِيمَـٰنِ ۚ وَمَن لَّمْ يَتُبْ فَأُو۟لَـٰٓئِكَ هُمُ ٱلظَّـٰلِمُونَ
অর্থ: হে ঈমানদারগণ! কোনো লোক যেন অপর লোককে উপহাস না করে, হতে পারে উপহাসকৃতরা তাদের চেয়ে উত্তম। এবং কোনো নারী যেন অপর নারীদের উপহাস না করে, হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। তোমরা একে অন্যকে দোষ দিও না, এবং একে অপরকে অপমানজনক নামে ডাকো না। ঈমানের পর ফাসিক নামে ডাকা কতই না নিকৃষ্ট! আর যারা তওবা করে না, তারাই তো জালিম।
[সূরা হুজুরাত : আয়াত ১১]
- যাচাই ছাড়া কথা বলা:
প্রায়ই দেখা যায় কোন কিছু শুনলেই ভালমন্দ যাচাই না করে প্রচার করা হয়, যা ইসলামে নিষেধ। এসবে ফিতনা প্রকট হয়,পারস্পরিক রেষারেষি দাঙ্গা বৃদ্ধিতে বলিষ্ট অবদান রাখে। কিছু দেখলেই আগপিছ না তাকিয়ে ফেইসবুক সহ সোস্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা মহা ভাইরাসে রুপান্তর হয়েগেছে।
এব্যাপারে কুরআনের বার্তা
يَـٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِن جَآءَكُمْ فَاسِقٌۭ بِنَبَإٍۢ فَتَبَيَّنُوٓا أَن تُصِيبُوا۟ قَوْمًۭا بِجَهَـٰلَةٍۢ فَتُصْبِحُوا۟ عَلَىٰ مَا فَعَلْتُمْ نَـٰدِمِينَ
অর্থ:“হে ঈমানদারগণ! যদি কোনো ফাসিক (পাপাচারী) ব্যক্তি তোমাদের কাছে কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তোমরা তা যাচাই করো, যেন অজ্ঞতাবশত কোনো সম্প্রদায়কে কষ্ট না দাও, আর পরে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত না হও।”
(সূরা হুজুরাত, ৪৯:৬)
হাদীসে নবীজী ﷺ বলেন:
كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ
“একজন ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা-ই শুনে তাই (যাচাই না করে) বলে দেয়।”
[সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১]
অন্যত্র এসেছে-
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“সেই ব্যক্তিই প্রকৃত মুসলমান, যার মুখ ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।”
(সহীহ বুখারী ও মুসলিম)
ফলাফল ও পরিণতি:
দলাদলি,উম্মাহ দুর্বল হয়ে পড়ে
গোঁড়ামি,সত্য চাপা পড়ে, অন্ধ অনুসরণ সৃষ্টি হয়
অহংকার, আত্মশুদ্ধির পরিবর্তে আত্মপ্রবঞ্চনা তৈরি হয়
উপহাস,পারস্পরিক বিদ্বেষ, ঘৃণা ও সংঘাত বাড়ে
সমাধান ও করণীয়:
১. কুরআন ও হাদীসকে মাপকাঠি বানাতে হবে।
২. আলেমদের মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ রেখে ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে হবে।
৩. মতভেদের ক্ষেত্রে সহিষ্ণুতা ও সৌজন্য অবলম্বন করতে হবে।
৪. অহংকার ও গোঁড়ামি থেকে বেঁচে সত্যের অনুসন্ধানী হতে হবে।
৫. উপহাস নয়, গঠনমূলক বার্তার মাধ্যমেই সংশোধনের চেষ্টায় নিয়োজিত হতে হবে।
উম্মাহর ভেতরের বিভক্তি বাইরের শত্রুর চেয়েও ভয়াবহ। তাই নিজেদের আত্মশুদ্ধি, আন্তরিকতা, এবং পারস্পরিক সম্মানবোধের ভিত্তিতে ইসলামি ঐক্য প্রতিষ্ঠা করাই সমযের সবচেয়ে জরুরি কাজ।
আল্লাহ সবার সহিহ বুঝদিন।
লিখেছেন: মুফতী আব্দুর রহমান রাহমানী
এই কন্টেন্ট শেয়ার করুন: